মাইক্রো কসমেটিক খতনা

মাইক্রো কসমেটিক খতনা / মুসলমানি সার্জিকেল মুসলমানির পরবর্তী উন্নত পদ্ধতি। যেটা আমার ২৯ বৎসরের চিন্তা ভাবনার ফসল। সার্জিকেল মুসলমানি হলো যা কেটে কেটে করতে হয়। যার নামেই হলো ডিসেকসান মেথড। আমি যখন ২৯ বৎসর আগে সার্জিকেল মেথডে মুসলমানি করতাম তখন অনেকটা আঁকা বাঁকা থাকত এবং নিচ দিয়ে ঝুলে থাকত, দুই সিলাইয়ের মাঝখানে একটা দাগ থাকত। বিশেষ করে কিছু বাঁচ্চার ক্ষেত্রে মুসলমানির করানোর প্রায় একমাস পর  চামড়ার নিচে কিছু গুটির মতো দেখা যেত।  এই গুটি গুলো ভিতরে রক্তনালী বন্ধের জন্য যে বিদেশী সুতা দ্বারা গিট্টু বা নট দেওয়া হত সেগুলো না মেশার কারণে হয়ে থাকত। কারো কারো ভিতরে ইনফেকশান হয়ে সাদা হয়ে যেত, চাপ দিলে ভিতর থেকে বের হয়ে চলে আসত। যাদের ইনফেকশান হতো না তাদের গুলো ভিতরে থেকে যেত।বলা হত যে, একটু গোল দেখা যাবে কিন্তু কোন অসুবিধা হবে না। তখন থেকেই চিন্তা শুরু হলো কিভাবে উন্নতমানের মুসলমানি করা যায়। বর্তমানে আল্লাহর অশেষ কৃপায় মাইক্রো কসমেটিক খতনাতে রক্ত বন্ধের জন্য আধুনিক মেশিন ব্যবহার করার কারণে ভিতরে আর গিট্টু বা নট দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কাটার পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ার কারণে গুটি ও থাকে না, আঁকা বাঁকাও থাকে না, কোন দাগও থাকে না। আজকে যে মুসলমানি হয়েছে তা বুঝার কোন উপায় নেই। দ্বিতীয় বার ডাক্তারের কাছে আসার প্রয়োজন নেই।

আমার ২৯ বৎসরের চিকিৎসক জীবনে ৭দিন বয়সের শিশু থেকে নিয়ে ২৫/৩৫ বৎসরের ব্যক্তিদের  হাজার হাজার মুসলমানি করা হয়েছে।অনেক বয়স্ক নও মুসলিম, হিন্দু  ও খৃষ্টান ভাইদের চিকিৎসার প্রয়োজনে খতনা করে দিয়েছি। আমার এই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে ৩ বৎসর বয়সের কম বাচ্চাদের মুসলমানী করা উত্তম।

এই দীর্ঘ সময়ে যেসব বাচ্চা পেয়েছি তাদের মধ্যে Micro Penis (অতি ছোট পেনিস ), ফাইমুসিস(একবারে চিকন ছিদ্র ও সামনে টাইট চামড়া), প্যারাপাইমোসিস (পেশাবের রাস্তার সুপারির পেছনে চামড়া টাইট হয়ে ফিতার মতো একটি বেন্ড হয়ে যায়। অনেকে এটাকে পয়গম্বরী মুসলমানী বলে। কিন্তু এটা ঠিক না, এটা একটা অসুখের নাম, যদি বেন্ড ভিতরের দিকে বেশি চাপ দেয় তাহলে সুপারিটা ফুলে ছোট বেলুনের মতো হয়ে যায়। পরে অপারেশন করতে হয়। অনেক রোগীর  Penis  ইনফেকশন হতে হতে পেশাবের রাস্তার ছিদ্রির উপরে একটি ছোট আবরণ পড়ে যায়। এতে প্রসাবে বাচ্চার বেশ কষ্ট হয় এবং ফোট ফোটা প্রসাব হয় ফলে প্রেসার দিয়ে প্রসাব করতে হয় এবং বাচ্চা কান্নকাটি করে। এতে করে বাচ্চার মূত্রথলিতে ইনফেকশন হয় ও কিডনিতে চাপ পড়ে। কিছু কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে দেখা গেছে ইনফেকশন হতে হতে ছিদ্রর আশে পাশে সাদা হয়ে ছাগলের সিনার হাড্ডির মতো শক্ত হয়ে যায়।

তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানে মুসলমানির জন্য কোন সময় সীমা নির্ধারিত নেই। যত আগে মুসলমানী করা যায় বাচ্চাদের জন্য উত্তম। মুসলমানী করানোর সাথে শীত, গ্রীষ্মের কোন প্রভাব নেই বরং শীতের চাইতে গরমের সময় বাচ্চারা খোলামেলা থাকতে পারে। আমাদের দেশে একটা প্রচলিত বিশ্বাস চলে আসছে যে,  শীতকালে মুসলমানী করতে হয়। মুসলমানী একটা মাইনর অপারেশন। গরমকালে কোন বাচ্চার এপিন্ডিসাইটিস হলে কোন ডাক্তার অথবা অভিভাবক শীতকালের জন্য অপেক্ষা করে না। শীতে ও গরমে শুকানোর একই সময় লাগে।

৩ বৎসর বয়সের কমে বাচ্চাদের মুসলমানী করালে সুবিধাসমূহ

  • ১। বাচ্চা মুসলমানী কাকে বলে জানে না। এতে করে তার আর ভয় থাকে না। বললেই হয় তোমাকে ধুয়ে পরিস্কার করে দেবে। আর ছোটদেরতো এই সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতাই নেই। একটু বড় হলে ফেইসবুক , ইউটিউব তথা সামাজিক প্রচার মাধ্যমে মুসলমানির বিভিন্ন কন্টেন্ট দেখে  বাচ্চাদের মনে ভয়ের সঞ্চার হয়। তাই পুরো অজ্ঞান করা ছাড়া তাদেরকে ম্যানেজ করা অভিভাবকদের জন্য অনেক কষ্ট হয়ে পড়ে। শিশু অপারেশনের কাটা ছেঁড়া  দেখার কারণে  কিছু বাচ্চা মুসলমানী করার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করে।
  • ২। রক্তনালী চিকন থাকাতে কোন রক্তপাত না হয় বললেই চলে।
  • ৩। অবসের ঔষধ খুবই কম লাগে।
  • ৪। খুব তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।
  • ৫। মাদ্রাসা ও স্কুলে ভর্তির আগেই অভিভাবকদের মুসলমানী সংক্রান্ত পেরেসানী দূর হয়ে যায়।
  • ৬। ছোটদের খাওয়ার ঔষধ খুবই কম লাগে।
  • ৭। ০৩ বৎসরে যেহেতু বাচ্চাদের পড়াশোনা থাকে না সেহেতু অভিভাবকদের সুবিধা অনুসারে বৎসরের যে কোন সময়ে মুসলমানী করিয়ে নিতে পারেন।
  • ৮।ছোট বেলায় বাচ্চাদের মুসলমানী কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে স্কুল ছুটিতে ওমরায় যেতে পারবেন এবং আত্মীয় স্বজনদের বাসায় বেড়াতে যেতে পারবে।

পুরুষের খতনাকে আধুনিক স্বাস্থবিজ্ঞানীরা অত্যন্ত স্বাস্থসম্মত বলে মনে করেন। খতনার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকজাতীয় (ব্যাকটেরিয়া) রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। খতনার প্রধান সুবিধা হলো, এর ফলে লিঙ্গের অগ্র ত্বকে যে তরল জমে নোংরা অবস্থার সৃষ্টি করে, তা থেকে রেহাই পেতে পারে। দেড় হাজার বছর আগে মহানবী (সা.) খতনার কথা বলেছেন, ব্যাপক গবেষণা শেষে আজকের আধুনিক বিজ্ঞান স্বীকার করেছে, খতনার ব্যাপক উপকারিতা আছে।
খতনার সুফল নিয়ে অস্ট্রেলীয় মেডিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক . ব্রায়ান মরিস চমৎকার গবেষণা করেছেন। তাতে উল্লেখ করা হয়, যেমন বালকের সারকামমিশন (খতনা) করা হয়নি,তাদের অপক্ষাকৃত কিডনি, মূত্রথলি ও মূত্রনালির ইনফেকশন চার থেকে ১০ গুন বেশি হয়। তিনি মনে করেন,সারকামসিশনের (খতনা) মাধ্যমে অন্তত এক-চতুর্থাংশ মূত্রনালির ইনফেকশন হ্রাস করা যায়।
ওয়াশিংটনের সৈনিক মেডিক্যাল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. বিজবেল বলেন, ‘আমি প্রথমে খতনার বিরোধী ছিলাম,পরে দীর্ঘ গবেষণার ফলে প্রমাণিত হলো যে মূত্রথলি ও মূত্রনালিবিষয়ক অনেক জটিল রোগের সমাধান খতনা।
ডা. রুবসন তাঁর গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন, ১৯৩০ থেকে এ পর্যন্ত ৬০ হাজার মানুষ আমেরিকায় মূত্রনালির ক্যান্সার আক্রান্ত হয়েছে,এর মধ্যে কেবল ১০ জন খতনাকৃত রয়েছে, বাকি সব খতনাবিহীন ব্যক্তি।
এ ব্যাপারে ইউরোলজি জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুত্রনালির প্রদাহ শিশুদের বেশি হয় এবং এতে কিডনির সমস্যা,জ্বর ও রক্তের ইনফেকশন পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি খতনা মরণব্যাধি এইডস ও যৌনরোগ প্রতিরোধ সহায়ক। সাধারণ অর্থে লিঙ্গের ক্যান্স্যার হলো অপরিচ্ছন্নতার ব্যাধি।পুরুষাঙ্গের শীর্ষে ঘা হয়ে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে একসময় ক্যান্সারে রুপ নেয়, এমন রোগীর ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে,খতনা করানো পুরুষের চেয়ে খতনা না করানো পুরুষ এ ধরনের ক্যান্সার বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে।
যৌনবিজ্ঞানীরা বহুকাল থেকেই পুরুষের খতনা বিশেষ উপকারীতা সম্পর্কে বলে আসছেন। বর্তমানে ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ ইউরোপেও প্রচুর পরিমাণে খতনা করানো হয়। সেখানে গুরুত্বের সঙ্গে এটা দেখা হয়।

খতনা (মুসলমানী) নবীদের সুন্নাত
খতনাকে আমাদের দেশে মুসলমানী বলা হয়। খতনা ইব্রাহিম আ. জামানা থেকে এই সুন্নাত আমাদের পর্যন্ত চলে আসা ইসলামের অন্যতম একটি বিধান।
আমাদের মুসলিম সমাজে এ সংস্কৃতি শত শত বছর ধরে চলে আসছে। এটি একটি মহান সুন্নাত। যুগে যুগে বড় বড় নবী-রাসূল ও সুন্নাত পালন করেছেন। সর্বপ্রথম এ সুন্নাত পালন করেছেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)। হজরত সাইদ ইবনে মুসাইয়াব (রহ.) থেকে বর্ণিত,হজরত ইব্রাহিম (আ.) হলেন খতনার সুন্নাত পালনকারী সর্বপ্রথম ব্যক্তি। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ২৬৪৬৭)

খতনা নবীদের সুন্নত। হজরত ইব্রাহিম (আ.) – এর পর সব নবী-রাসূল খৎনা করিয়েছিলেন। অনেক হাদিস শরিফে এ সুন্নাত পালনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, ফিতরাহ, অর্থাৎ মানুষের জন্মগত স্বভাব পাঁচটি-খতনা করা, নাভির নিম্নদেশে ক্ষুর ব্যবহার করা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা, নখ কাটা ও গোঁফ খাঁটো করা। সহিহ বুখারি,হাদিস : ৫৮৮৯)

বয়স্ক হওয়ার পর কেউ ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তার খতনা করা জরুরী। নবমুসলিমকেও খতনা করে নিতে হবে। ইবনে শিহাব যুহরী রাহ. বলেন, কোন ব্যক্তি যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহন করত তখন সে বড় হলেও তাকে খৎনা করার আদেশ করা হত। (আলআদাবুল মুফরাদ, হাদীস: ১২৫২) খতনা উপলক্ষ্যে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করার প্রমাণ নেই। তাছাড়া এত গান-বাদ্য ইত্যাদি শরীয়তবিরোধী কোনো কিছু থাকলে তা তো সম্পূর্ণ নাজায়েয হবে। (ফাতহুল বারী ১১/৯২,৯/৫০৩, ১০/৩৫৫,৪/৪১৩;রদ্দুল মুহতার ৬/৭৫১-৭৫২/২৮২; খুলাসাতুল ফতাওয়া ২/১৩২; আলবাহরুর রায়েক ৭/১৫-৯৬)

মাওলানা ইদ্রীস কন্ধলবী (রহ.) এর লিখিত সীরাতে মুস্তফা (সাঃ) এ আমাদের নবী করীম (সাঃ) খাতনা সম্পর্কে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। যথাঃ
এক, হুযুর খাতনাকৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছেন। হাকীম বলেন, এ সম্পর্কে এত অধিক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে যে সেগুলো মুতাওয়াতির – এর শ্রেণীভুক্ত হয়ে গেছে।
দুই, নবীজীর দাদা আব্দুল মুত্তালিব রাসূলে মাকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মগ্রহের সপ্তম দিনে তাঁর খাতনা করান। হযরত ইব্রাহীম ও ঈসমাঈল (আ.) – এর সুন্নাত ভুমিষ্ঠ হওয়ার সপ্তম দিনে তার খাতনা করানো। আরব দেশে তাই এই প্রথাটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।
তিন, নবীজীর দুধমাতা হযরত হালীমা সাদিয়্যার প্রতিপালনে থাকাকালে তাঁর খাতনা করানো হয়। তবে এ শেষোক্ত মতটি নেহায়েত দুর্বল। সে তুলনায় প্রথমক্ত দুইটি মত গ্রহণযোগ্য ও প্রসিদ্ধ। তবে এ দুইটি মতে সামঞ্জস্য বিধান করাও সম্ভব। হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাতনকৃত অবস্থাতেই ভূমিষ্ঠ হয়েছেন এবং জন্মের সপ্তম দিনে আব্দুল মুত্তালিব তা পূর্ণভাবে সম্পাদনের ব্যবস্থা করেন।